চাঞ্চল্যকর তথ্য: লাখ লাখ পড়ুয়াকে শেখানো হচ্ছে মুসলিম ঘরের ছেলেরা ‘সন্ত্রাসী’!

0
49

আরএসএস পরিচালিত “হিন্দু” মেলায় হিন্দু মহিলাদেরকে শেখানো হচ্ছে যে মুসলিম ঘরের ছেলেরা  ” সন্ত্রাসী ” এবং এরকম আরো নানা শিক্ষা’ শীর্ষক নিউজটি দি ওয়ারে প্রকাশিত হয়েছে।বি বি এন বাংলার পাঠকদের জন্য তা অনূদিত হলো।

জয়পুর জেলার  শিক্ষাদপ্তর  লাখ লাখ সরকারি স্কুল পড়ুয়াদের জন্য এই অনুষ্ঠানে যোগদান বাধ্যতামূলক করে । কট্টর হিন্দুত্ববাদী মহলগুলি অনুষ্ঠানটিতে ‘লাভ জেহাদ’ ও ‘গোরক্ষা’ ইত্যাদি প্রোপাগান্ডাকে বিস্তার করে চলেছে।
হিন্দু স্পিরিচ্যুয়াল এন্ড সার্ভিস ফাউন্ডেশান (এইচএসএসএফ) কর্তৃক আয়োজিত বৃহস্পতিবার থেকে চলা পাঁচদিনের এই মেলায়  তাদের মূল লক্ষ্য  হলো “হিন্দু দর্শন মতে বাস্তবসম্মত ভাবে ব্যাখ্যা করে বেঝানো যে কিভাবে ঐতিহ্যবাহী হিন্দু জীবন ব্যবস্থা – পারিবারিক এবং মানবিক মূল্যবোধ , মহিলাদের সম্মান, স্বদেশ প্রেম, পরিবেশ, বাস্তুতন্ত্র এবং দূষণের মতো প্রতিটি সমকালীন সমস্যাগুলির মোকাবিলায় সমাধান পেশ করে।”

যায় হোক, প্রদত্ত এই সমস্ত ‘সমাধান’ গুলি বিচার করলে বোঝা যায় যে হিন্দুত্ববাদী দলগুলি এই অনুষ্ঠানের ময়দানকে ব্যাবহার করে লক্ষ লক্ষ স্কুল পড়ুয়া যাদের মেলায় যোগদানকে বাধ্যতামুলক করা হয় ও সরলমনা দর্শনার্থীদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক-বিষ ছড়ানোর কাজ করা হচ্ছে।
“এই নির্দেশটি (সরকারি স্কুলগুলিকে  সকল ছাত্র ছাত্রীদের  নিয়ে আসার জন্য) দেওয়া হয়েছে যাতে স্কুল পড়ুয়ারা উন্নত হিন্দু সংস্কৃতী সম্পর্কে জানতে পারে। এছাড়া আর কি উদ্দেশ্যেই বা হতে পারে? “দ্যা ওয়ার নামক সর্বভারতীয় একটি পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাতকারে জয়পুর জেলার শিক্ষা আধিকারিক এই কথা জানান
চেন্নাই হতে পরিচালিত এইচ এস এস এফ নামক এই সংস্থাটি নিজেদেরকে একটি নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসাবে দাবি করে থাকে। কিন্তু বাস্তবে, সংগঠনটি আরএসএস এর সঙ্গে যুক্ত এবং এরই শাখা হলো রাষ্ট্রীয় সেবা ভারতী। বিজেপি এবং আরএসএস কর্মীরা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে  এই প্রতিষ্ঠানের কার্যবিধি পরিচালনা করে থাকে যদিও বেশির ভাগ সাধারণ হিন্দু তাদের আয়োজিত মেলায় যোগদেন  একটি ধর্মীয় উৎসব এই সরল বিশ্বাসে, এটি কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডা এটা তারা জানেন না ।
“এইচ এস এস এফ রাষ্ট্রিয় সেবা ভারতীর সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন সংগঠনকে একটি প্লাটফর্ম প্রদান করে যাতে তারা সমাজ সেবায় ব্রতী হতে পারে। আদর্শগত ভাবে এটি আরএসএস এর মতোই একটি সংগঠন, কিন্তু এরা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত নয়’, গুনবন্ত সিং কোঠারী আরএসএস প্রচারক ও এইচ এস এস এফ এর জাতীয় তত্ত্বাবধায়ক দ্যা ওয়ার সংবাদ মাধ্যমকে কথাগুলি জানান ।
ছোটো হাতবই “লাভ জেহাদ” র উপর
উক্ত মেলায় বজরং দল খুল্লাম খুল্লা প্রত্যেকটি পথচলতি মহিলাদেরকে লাভ জেহাদের উপর লেখা চটি বই, লিফ লেট ইত্যাদি বিতরণ করে চলেছে। এক স্কুল পড়ুয়া  এসব “ফালতু” বলে লিফটলেটটি নিতে অস্বীকার করলে তত্বাবধায়ক চৌথমল গুপ্ত বিড় বিড় করে বলতে থাকেন “আজকালকার এইসব ছুকরিরা কেনো কথাই কানে নিতে চায়না।”
তিনি আরও যোগ করেন, “চটি বই গুলিতে  কারিনা কাপুর খানের ঘটনাটি (উদাহরণ হিসাবে)  তুলে ধরার কারণ হলো এইসব বাচ্চারা খানেদেরকে (অভিনেতা খানেদেরকে ইঙ্গিত করে ) আদর্শ হিসাবে গ্রহণ করে, ওদের বোঝা উচিত লাভ জেহাদ আসলেই একটা ফাঁদ।”
“ইসলামে হাজার বছরের ও প্রাচীন রীতি হলো ধর্মান্তরিত করা।” এছাড়া বজরং দলের সব ম্যানুয়াল গুলিতে আরো বিশদ ভাবে লেখা হয়েছে কিভাবে মুসলিম ছেলেরা হিন্দু মহিলাদেরকে ফাঁদে ফেলে – “স্কুলে বন্ধুত্ব পাতিয়ে বাইকে চড়ায়, রেস্টুরেন্টে খেতে নিয়ে যায়, মোবাইলে চ্যাট করে, তাদের পিতামাতাকে সম্মান দেখায়, তাদের গোপন ছবি নিয়ে ব্ল্যাকমেল করে।”
সেখানে আরো লেখা আছে  “আক্রান্ত” হিন্দু পরিবারগুলির সতর্কতা হিসাবে কী করণীয়- ” মাঝে মাঝে মেয়েদের ব্যাক্তিগত জিনিস পত্র চেক করা দরকার, ফোন কল ও এসএমএস এসবে বিস্তারিত নজরে রাখা, কোনো মুসলিম ছেলেকে হিন্দু মেয়ের সঙ্গে ঘুরতে দেখলে তাকে সতর্ক করা, বাড়িতে মেয়েদের সামনে মুসলিম ছেলেদেরকে – আপদ / সন্ত্রাসী/ চোরাকারবারী/বিশ্বাস ঘাতক/পাকিস্তানের সমর্থক ইত্যাদী নামে ডাকতে হবে । ”
এই ম্যানুয়ালে আরো বলা আছে যে , মুসলিম ছেলেদেরকে ‘রেট কার্ড’ দেওয়া হয় যেটি দেখে   হিন্দু মেয়েদের কে ধর্মান্তরিত করার “সাফল্য” হিসাবে অর্থকড়ি দেওয়া হয় । “প্রতি একজন পিছু ধর্মান্তরিতকরণের জন্য লক্ষ লক্ষ টাকা দেওয়া হয়, ” মিষ্টার গুপ্তা দ্যা ওয়ার কে জানান।
মজার বিষয় হলো, যদি কোনো মুসলিম মেয়ে হিন্দু ধর্মে আসতে চায় তাহলে সে ধরনের বিয়েতে হিন্দু পরিবারগুলিকে ম্যানুয়ালটিতে উৎসাহিত করা হয়েছে ।
আর যদি কোনো হিন্দু মেয়ে কোনো মুসলিম ছেলেকে বিয়ে করতে চায় সেক্ষেত্রে হিন্দুপরিবাগুলি যেন  মুসলিম ছেলেটিকে হিন্দু ধর্মে ধর্মান্তরিত করে । ঘটনাক্রমে যে “রেট কার্ড” এর  কথা বলে হয়েছে তা সর্বপ্রথম টাইমস নাউ নামক সংবাদ সংস্থার সম্পাদক রাহুল শিবশংকর তার নিউজ স্টোরিতে এটি প্রচার করেন ; অল্টরনেটিভ নিউজ এজেন্সি যেটিকে সম্পূর্ণ ভূয়ো প্রমাণ করতে সক্ষম হয়। অপর দিকে কোবরা পোস্ট ২০১৫ সালে একটি স্টিং অপারেশন করে যা থেকে স্পষ্ট যে উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনী প্রচারে বিজেপি ও আরএসএস তাদের রাজনৈতিক ফায়দা লাভের জন্য এধরনে সাজানো গল্পের আশ্রয় নেয়।
‘গো’রক্ষা এবং গরু ভারতের জাতীয় পশু
ভারতীয় গো রক্ষা মঞ্চ নরেন্দ্র মেদীর শুধু মাত্র  গোরু হত্যা বন্ধ করার নির্দেশে সন্তুষ্ট নয় (বর্তমানে সুপ্রীমকোর্ট এই রায়কে স্থগিত রেখেছে) তারা এই মেলার অনুষ্ঠানে দাবি করে যে গোরু হত্যার সাজা  হিসাবে মৃত্যুদন্ড ঘোষণা করতে হবে।
“গরু হত্যা বন্ধের নির্দেশ কেবল কাগজে কলমেই সীমাবদ্ধ , আমরা চাই গরুকে জাতীয় পশুর মর্যাদা দেওয়া হোক,” মঞ্চটির সঙ্গে যুক্ত তারা চান্দ বাবু  জানান।
“গরু নিয়ে আজকের যা কিছু শুনছেন এর পেছনে যাবতীয় অবদান আমাদের গুরু
গোপাল মানি জীর। তিনি  প্রত্যেক রাজ্যে ‘গৌ কথা’ প্রচার করে চলেছেন গরুর প্রতি আমাদের সংবেদনশীলতা বাড়ানোর লক্ষ্যে, “তিনি আরো জানান ।
গো’রক্ষকদের সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি জানান, ” সকল গো’রক্ষকরা খারাপ নন। সংবাদমাধ্যমগুলি  আসলে নেতিবাচকভাবে খবরগুলি পরিবেশন করছে।”
“গো’রক্ষকদের উচিত আইন হাতে তুলে নেওয়া কারণ সরকার আমাদের মা (গো মাতা ) কে রক্ষার জন্য কোনো সদর্থক ভূমিকা নিচ্ছেনা। গো মাতা হলো সকল দেবতাদের দেবতা।”
তাদের ছাপানো ক্ষুদ্র পুস্তকাদিতে বজরং দল কংগ্রেস ও বিরোধী দল গুলিকে গো হত্যা বন্ধ করার জন্য কোনো নির্দেশ বলবৎ না করায় তাদেরকে দোষারোপ করে।
অনুষ্ঠানটিতে বিভিন্ন  স্কুল পড়ুয়াদের উদ্দেশ্যে গো রক্ষার উপর দেওয়া তার বক্তব্যে বক্তা  মুল চান্দ বলেন , “এমনকি দুধের জন্য ছাগল ও মহিষ কে বাড়িতে পোষা হলেও তাদের কে মা বলা যাবেনা । একমাত্র গোরু হলো আমাদের মা। ”
নিরামিষ ভোজনের প্রচার
উজ্জয়নী থেকে আসা বাবা জয় গুরু দেব সকলের কাছে “বিনিত” অনুরোধ রাখেন তারা যেন তাদের সন্তান সন্ততির উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য , মহিলাদের সম্মান রক্ষার তাগিদে , রোগ জীবাণুর বিরুদ্ধে শরীরে অনাক্রমতা গড়ে তুলতে, এমনকি শুধু মাত্র ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্য  তারা যেন শুধু মাত্র নিরামীষ খাদ্য  ভক্ষণ করেন ।
“এই সব লোকেরা মাংস খেয়ে খেয়ে পেটগুলো কে কবর স্থান বানিয়ে ফেলেছে।
আমাদের হিন্দুয়ানি ঐতিহ্য কখনই নিরীহ পশুদের উপর নিষ্ঠুরতাকে অনুমোদন করে না ,” দোকানের স্বেচ্ছাসেবী জানান।
তিনি সকল আগন্তুেকের হাতে “নিরামীষ প্রতিজ্ঞা ” (vegetarian pledge) নামক একটি করে চটি বই ধরিয়ে দিয়ে
তিনি আরো বলেন , “বাবা তার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে হাজার হাজার মাংসাষীদের কে নিরামিষাশীতে রুপান্তরিত করে বিশ্ব রেকর্ড করেছেন।”
‘হিন্দু’ ন্যায়শাস্ত্র অনুযায়ী মেলায় উপস্থিত ছাত্র ছাত্রীদেরকে বন ও বন্য প্রাণী সংরক্ষণে উদ্যোগী হতে বলা হয়। “বন্যপ্রাণীরা হিন্দু দেব দেবীদের সেবায় ব্রতী হয়েছিলো তাই তাদের সংরক্ষণ করা একান্ত কর্তব্য।”
বাস্তু তন্ত্র রক্ষা কল্পে একটি অনুষ্ঠানের সূতনা করা হয় যেখানে ছাত্রছাত্রীদের কে ‘তুলসি’ ও ‘গো’পূজায় অংশ গ্রহণ করতে বলা হয়। যাইহোক, তাদের মধ্যে বেশির ভাগই নিশ্চিত নন তারা কেন তা করছে।
“আমরা যেকোনো অনুষ্ঠানের সূচনায় ঈশ্বরের  প্রার্থনা দিয়ে শুরু করি সেজন্যই বোধ হয় আমাদেরকে তুলসী গাছকে পূজা করতে বলা হয়েছে ,” পূজোয় অংশগ্রহণকারী গোবিন্দপুর  গভর্মেন্ট স্কুলের দশম শ্রেণীতে পাঠরত  কৃষ্ণা জানায়।
রাম মন্দির, জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রতীক
এইচ এস এস এফ এর আয়োজিত মেলাটিতে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ বিবাদমান রাম মন্দির ইস্যু  কে কোটি কোটি হিন্দুর ভাবাবেগের সঙ্গে একাত্ম করে  অযোধ্যায় রাম মন্দির স্থাপনের দাবিকে পুনরাবৃত্তি করেন। তারা ছোটো ছোটো খন্ড পুস্তক বিলি করেন ও “ভোট দেওয়ার সময় বৃহত্তর হিন্দু স্বার্থের কথা  মাথায় রাখতে” বলেন ।
এধরনের মেলার আয়োজনের প্রাসঙ্গিকতা বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে হেমরাজ চতুর্বেদী নামক এক স্বেচ্ছা সেবী উত্তরে বলেন ,”
আপনি কি কখনো মুসলিমদেরকে  এধরনের মেলার আয়োজন করতে দেখেছেন? একমাত্র হিন্দুরাই চায় তাদের ভবিষ্যত প্রজন্মকে তাদের জাতির পবিত্র ঐতিহ্য বিষয়ে সচেতন করতে ।”
দ্যা ওয়্যার সংবাদমাধ্যম কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রাজস্থান বিশ্ববিদ্যালয়ের সোশ্যিওলজি বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক রাজীব গুপ্ত জানান ,” এই ধরনের অনুষ্ঠানগুলি স্বত:স্ফূর্ত নয় , স্কুল পড়ুয়াদেরকে যোগ দিতে বাধ্য করা হয় । আরএসএস সবসময় নিজেদেরকে  আড়ালে রাখার চেষ্টা করে এবং এধরনের হিন্দু সংগঠনগুলি ও  অনুষ্ঠানগুলির সঙ্গে যুক্ত থাকার পরও তা তারা অস্বীকার করে।”
সম্প্রতি এইচএসএসএফ ( HSSF) রাজস্থান সরকারের সঙ্গে  মিলিত হয় একটি বিশাল ‘বন্দে মাতরম’ আবৃত্তি অনুষ্ঠানের আয়োজন করার জন্য । এনএসএস ( ন্যাশন্যাল সার্ভিস স্কিম ) এর সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেককে এই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে হয়। যদিও “জাতি প্রেম” ও “দেশ প্রেমের” লক্ষে তেরঙ্গা উত্তোলন করা হয়, কিন্তু পতাকার মধ্য ভাগে কোনো অশোক চক্র ছিলোনা।
শ্রুতি জৈন,
জয়পুর থেকে উদিত সংবাদিক
(বি বিএন বাংলায় অনূদিত এই প্রতিবেদনটি জাতীয় মিডিয়া দ্যা ওয়ারে ১৮ নভেম্বর২০১৭ প্রকাশিত হয়েছে। বি বি এন বাংলার ছবি গুলিও ওই মিডিয়া থেকে নেওয়া।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here