ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রাম, ইতিহাস থেকে বর্তমান

0
39

পর্ব-০১

৭১২ খৃষ্টাব্দে দামেষ্কের খলিফা আল-ওয়ালিদের আশির্বাদপুষ্ট ও বাগদাদের গভর্নর হাজ্জাজ বিন ইউসুফের দ্বারা পরিচালিত মুসলিম সেনাপতি মুহাম্মদ বিন কাসিম (র:) কর্তৃক দক্ষিণ পাঞ্জাবের সিন্ধু ও মুলতান অধিকারের মধ্য দিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলমান শাসনের সূচনা হয় এবং পর্যায়ক্রমে ১৭৫৭ খৃষ্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভাড়াটিয়া বাহিনীর হাতে বাংলার নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পরাজয় ভারতে ইসলামি শাসন সমাপ্তির সূচনা করে। পরবর্তীতে ১৭৯৯ সালে মহীশুরের সর্বশেষ স্বাধীন মুসলিম শাসক শহীদে ওতন টিপু সুলতান (র:) -এর ইংরেজদের হাতে পরাজয় কার্যকরভাবে ভারতে মুসলিম শাসনের ইতি টানে। আর তখন থেকেই শুরু হয় বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসন । শুরু হয় ভারতীয়দের প্রতি অন্যায়,  অবিচার, শোষণ, লুণ্ঠন, নির্যাতন আর নিপিড়নের এক করুণ অধ্যায় । শুরু হয় খৃষ্টীয় সংস্কৃতির আমদানি আর ভারতীয় সংস্কৃতির বিসর্জন ।

                     বৃটিশ শাসনের পরিনতি কি হতে পারে? ভারতীয়রা আরম্ভনিতে টের না পেলেও ভবিষ্যত গণনা করতে পেরেছিলেন দেশের ইসলামী পন্ডিত, উলামারা! তাইতো ১৮০৩ খৃষ্টাব্দে প্রথম বারের মত ইংরাজ বিরোধী ফতোয়া প্রদান করেছিলেন দিল্লির  প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস শাহ আব্দুল আজিজ দেহলভী (র:)। উপমহাদেশের ইসলামী চিন্তানায়ক শাহ ওলিউল্লাহ দেহলভীর সুযোগ্য পুত্র আব্দুল আজিজ তদানীন্তন হিন্দুস্তানকে ‘দারুল হ়ারব’ (যেখানে অমুসলিমদের শাসন প্রতিষ্ঠিত এবং মুসলমানদের ধর্মীয় নিয়ম নীতি পালনে বাধা দেওয়া হয়, বা নিষিদ্ধ) ঘোষণা করেন। এ প্রসঙ্গে তাঁর একটি ফতোয়ায় বলেন: “এদেশে খৃষ্টান শাসকদের শাসন চলছে। তাদের শাসন চলার অর্থ হচ্ছে, দেশ পরিচলনা, প্রজা পালন, আইন-শৃংখলা ব্যবস্থা, এক কথায় সামরিক, বেসামরিক, পুলিশ, দেওয়ানী ও ফৌজদারী সকল বিষয়ের উপর পূর্ণ কর্তৃত্বে তারাই সমাসীন। তাদের এসব কাজে হিন্দুস্তানীরা কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ করতে পারে না। আর এতে নিজের মাতৃভূমিতে পদদলিত হচ্ছে ভারতীয়দ হিন্দু/মুসলমানদের মৌলিক অধিকার। সুতরাং দারুল হারব অনুযায়ী ইংরাজদের বিরোধিতায় এগিয়ে আসতে হবে। “—-   সেই ফতোয়ার অনুসরণে সর্ব প্রথম ভারতীয় উলামারা স্বাধীনতা আন্দোলনের সূচনা করেন।

                                                    

পর্ব -০২
সাধারণ মুসলমানরা যখন বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসন ও তাদের শোষণ ও লুন্ঠন নীতিতে ছিলেন জর্জরিত । নিজের সজ্ঞানে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ ছিল সাংঘাতিক জটিল সেই মুহূর্তে শাহ আব্দুল আজিজ মুহাদ্দিসে দেহলভীর ফতোয়া সাধারণ মুসলমানদের জন্য ছিল যেমন চাতক পাখির মুখে এক বিন্দু জল। এবং এ ফতোয়ার ইতিবাচক প্রভাব ভারতীয় মুসলমানদেরকে উৎসাহিত করেছিল বৃটিশ বিরোধিতায়। মুসলিম উলামাদের নেতৃত্বে ডাক দেওয়া হযেছিল জাতীয় একতার, মুসলমান ও মারাঠীদের মধ্যে চলে আসা
অতীতের সমস্ত দন্ধ কলহের আপোষ নিস্পত্তি ঘটিয়ে একসাথে আরম্ভ হয় বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন ।
                          এদিকে ১৮০৮ খৃষ্টাব্দ থেকে ১৮১৮ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত সময়কাল,  ভারতীয়দের জন্য ছিল চরম দুর্ভাগ্যের দিন । বৃটিশ শাসনের উত্থান ভারতবর্ষের ছোট বড় সমস্ত শক্তিকে পরাজিত করে বৃটিশ পতাকার দুর্গন্ধ কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী ও মুম্বই থেকে আসাম পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল । ইংরাজদের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে কথা বলার কারো সাহস ছিল না বরং সাদা চামড়ার সম্মুখে মাথা নত করতে সবাই প্রস্তুত ছিলেন । কিন্তু সেই সঙ্কট পূর্ণ মুহূর্তেও শাহ ওলিউল্লাহ দেহলভী রচিত ও শাহ আব্দুল আজিজ দেহলভীর নেতৃত্বে এমন এক বীর গোষ্ঠী ছিল, যারা বৃটিশ শক্তির বিরোধীতায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল । এই সেই সময় যখন মহবুবে ওতন শাহ আব্দুল আজিজ দেহলভী নিজের বার্ধক্য ও অন্ধতা থাকা সত্ত্বেও দেশের মুক্তিসংগ্রামে পিছপা হননি বরং কোরান ও সুন্নাহকে সম্মুখে রেখে তৈরি করেছিলেন ‘ইনক্বিলাভী কমিটি’। আর সেই কমিটির মাধ্যমে একটি সম্পূর্ণ কর্মসূচি নিয়ে হেফাজতে ওতনের উদ্দেশ্যে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন স্বাধীনতার যুদ্ধে ।
             
ইনক্বিলাভী কমিটি ও কর্মসূচি :- শাহ আব্দুল আজিজ দেহলভীর আহ্বানে স্বীয় খলিফা মওলানা সৈয়দ আহমদ (র:)-এর নেতৃত্বে তৈরি করা হলো এক শক্তিশালী গ্রুপ ভিত্তিক কমিটি । যেখানে প্রথম গ্রুপের নেতা মওলানা সৈয়দ আহমদকেই নির্ধারণ করে তার সহযোগী সদস্য হিসাবে মওলানা আব্দুল হাই ও মওলানা ইসমাঈল শহীদ (র:)কে নিয়োগ দিয়ে সমস্ত দেশে পরিবর্তন ও সচেতনতা সৃষ্টি সহ সামরিক প্রশিক্ষণ ও বৈদেশিক সম্পর্ক গড়ে তোলার দায়িত্ব সমজে দেওয়া হল।
                  এদিকে দ্বিতীয় গ্রুপের আমীর স্বয়ং শাহ আব্দুল আজিজ দেহলভী । হযরত দেহলভী নিজ দায়িত্বে কমিটির সবথেকে গুরুত্ব পূর্ণ জটিল বিষয়গুলো সমজে নিলেন। ২য় গ্রুপের দায়িত্বের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য শাহ ওলিউল্লাহ দেহলভী রচিত পদ্ধতিতে শিক্ষার সম্প্রচার ও আধ্যাত্মিক প্রশিক্ষণ, সমস্ত আন্দোলনের কেন্দ্র হিসাবে দিল্লির উপকন্ঠে ওলিউল্লাহ প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসাটির পরিচালনা ও অর্থনৈতিক সমস্ত ব্যবস্থা । এই গ্রুপের সদস্যদের মধ্যে ছিলেন মওলানা শাহ মোহাম্মদ ইসহাক্ব দেহলভী, মুফতি রসিদ উদ্দিন দেহলভী, মওলানা হাছন আলী লক্ষ্ণৌবী, মওলানা শাহ আব্দুল গণী দেহলভী, শাহ ইয়াকুব দেহলভী, মুফতি ছদরুদ্দীন দেহলভী ও মওলানা হুসাইন আহমদ মলীহাবাদী।
              সেই ১৮১৮ সাল সৈয়দ আহমদ, মওলানা আব্দুল হাই ও মওলানা ইসমাঈল শহীদ নেতৃত্বাধীন প্রায় ৫০ সদস্য বিশিষ্ট উলামা গ্রুপ সরকারী কঠোর নিয়ম নীতি উপেক্ষা করে জাতীয় রাজধানী দিল্লি থেকে উত্তর দিকে গাজী উদ্দিন নগর (বর্তমান গাজীয়াবাদ) হয়ে উত্তর প্রদেশের মুরাদনগর, মিরঠ, মুজফ্ফরনগর, দেওবনেদ, সাহারানপুর, রামপুর, বেরলী অতিক্রম করে শাহজাহানাবাদ পৌছে বক্তব্য ও পরামর্শের মাধ্যমে সামাজিক সচেতনতার কাজ আরম্ভ করলেন । এই ভাবে দিনের পর দিন এক যায়গার পর অন্য যায়গায় স্বীয় মুর্শীদের দেওয়া কর্মে নিয়োজিত থাকেন মওলানা সৈয়দ আহমদ সহ তার সহযোগীরা
                                               
পর্ব-০৩
মওলানা সৈয়দ আহমদ বেরেলভী নেতৃত্বাধীন ‘ইনক্বিলাভী কমিটি’-র সদস্য সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তে লাগলো । মুসলমানদের মত অসংখ্য হিন্দুরাও মওলানা সৈয়দ আহমদের ক্বাফেলায় যোগদান করলেন। অন্যদিকে স্বয়ং মুসলিম সমাজের ইসলামী জীবনাচরণে দীর্ঘকাল যাবৎ বিপুল অনৈসলামিক আক্বীদা-বিশ্বাসের শক্ত অবস্থান স্বাভাবিকভাবেই এ অঞ্চলে এক সর্বব্যাপী সংস্কারমূলক বিপ্লবের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে রেখেছিল। সেই অনাগত বিপ্লবের হাতছানিই যেন ঊনবিংশ শতাব্দীর ঊষালগ্নে সৈয়দ আহমাদ শহীদের আন্দোলনের হাত ধরে উপমহাদেশের শিরক-বিদ‘আতী জঞ্জালের অন্ধকার গহ্বরে তাওহীদী নবপ্রভাতের সূচনা ঘটায়।

     
বালাকোট যুদ্ধ :– ১৮৩১ সালের ৬ মে সংঘটিত ঐতিহাসিক এই বালাকোট যুদ্ধ একদিকে যেমন ছিল এই সংস্কারবাদী আন্দোলনের জন্য চরম বিপর্যয়ের কারণ , অপরদিকে বিদেশী বেনিয়াদের হাত থেকে স্বাধীনতা লাভের জন্য উপমহাদেশের বুকে পরিচালিত সর্বপ্রথম সুসংঘবদ্ধ রণডঙ্কা। পাকিস্তানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের খাইবার-পাখতুনখাওয়া অবস্থিত দূর্গম পাহাড় ঘেরা বালাকোট শহর । তৎকালীন পেশোয়ারের সুলতান মুহাম্মাদ খাতেনের ষড়যন্ত্রে ইসলামী হুকুমতের ক্বাযী, তহসিলদারসহ বহু কর্মচারীর গণহত্যার প্রতিবাদে সৈয়দ আহমাদ দ্বিতীয় দফা হিজরত করার মানসে কাশ্মীর অভিমুখে যাত্রা করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। অবশেষে অনেক কষ্টে মুজাহিদ বাহিনীসহ সাইয়েদ আহমাদ ব্রেলভী ১৮৩১ সালে ১৭ এপ্রিল বালাকোটে প্রবেশ করেন। উপমহাদেশের জিহাদ আন্দোলনের পথিকৃৎ, আল্লাহর পথের নিবেদিতপ্রাণ বীর সিপাহসালার সাইয়েদ আহমাদ ব্রেলভী তাঁর সূক্ষ্ম পরিকল্পনা মাফিক বালাকোটে প্রবেশ করেন পরবর্তীতে ৬ই মে ১৮৩১ সালে পবিত্র জুম‘আর দিন ১০ হাজার বিরোধীদের বিপক্ষে ৭০০ যুদ্ধা নিয়ে মওলানা সৈয়দ আহমাদের মুজাহিদ বাহিনী চূড়ান্ত যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নেন। সৈয়দ আহমদ র: মুজাহিদ বাহিনীর অগ্রভাগে ছিলেন। তার সাথে ছিলেন একান্ত সহযোগী শাহ ইসমাঈল (র:)। হঠাৎ করে সাইয়েদ আহমদ ব্রেলভী মেটিকোটের ঝরনার মধ্যে শাহাদত বরণ করেন এবং শাহ ইসমাঈলও শাহাদত বরণ করলেন। মুজাহিদগণের একটি বড় দল সৈয়দ আহমাদের শাহাদত বরণের বিষয়টি উপলব্ধি করতে না পারায় তাঁর সন্ধানে ঘুরে ঘুরে শাহাদত বরণ করলেন।  পরবর্তীতে আন্দোলন অব্যাহত থাকলেও যোগ্য নেতৃত্বের অভাবে উপমহাদেশের প্রথম স্বাধীনতা সসস্ত্র আন্দোলনটি অচিরেই স্তিমিত হয়ে পড়ে।
                                                                                                                       
পর্ব-০৪
মহা বিদ্রোহ ও হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কীর অস্থায়ী সরকার গঠন :–  সাল ১৮৫৭ । কার্তুজে শুকর-গরুর চর্বি মিশ্রণের গোজব ও ইংরেজের বিগত একশো বছরের শাসন জনগণের মধ্যে বিক্ষোভ সিপাহী বিদ্রোহের বিভিন্ন কারণ সৃষ্টি করে দিয়েছিল।  ভারতে ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে হিন্দু-মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ ভাবে ধূমায়িত আক্রোশের এটাই ছিল প্রথম বিস্ফোরণ। ইংরেজরা এই মহা বিদ্রোহকে কেবল মাত্র সিপাহীের আন্দোলন বলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও আসলে এটা কেবল সিপাহী বিদ্রোহ ছিল না; বরং সিপাহীদের সাথে সাথে জনগণেরও বিদ্রোহ ছিল। লাখ লাখ সাধারণ মানুষও প্রত্যক্ষভাবে অস্ত্র ধরে লড়াই করেছেন এই মহা যুদ্ধে, কোটি কোটি মানুষ তাদের সমর্থন করেছেন এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে অর্থ, খাদ্য ও অস্ত্র যুগিয়েছেন সাধ্যানুসারে এবং অনেক ক্ষেত্রে সাধ্যাতীতভাবে।

                   ১৮৫৭ সালের ১০ মে মিরাট শহরে শুরু হওয়া সিপাহী বিদ্রোহ ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে বালাকোটের পর সংঘটিত একটি আলোড়ন সৃষ্টিকারী অধ্যায়। আর মুলত এ অধ্যায়ের রচনা করেছিলেন হাজী এমদাদ উল্লাহ মুহাজিরে মক্কির দুই আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক শিষ্য মাওলানা কাসেম নানতুভী ও মাওলানা রশীদ আহমদ গাংগুহী । মওলানা সৈয়দ আহমাদের ইনক্বিলাবী আদর্শে আদর্শান্বীত এই উলামারা । এছাড়াও দেশ রক্ষার আন্দোলনে জড়িয়ে পড়লে জাতী ধর্ম নির্বিশেষে সকল ভারতীয় । ঝাঁসির রানি লক্ষ্মী বাঈ, তুলসীপুরের রানি ঈশ্বরী কুমারী দেবী প্রমুখেরা ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে লোকনায়কে পরিণত হন। অন্যান্য প্রধান নেতৃবর্গের মধ্যে নানা সাহেব, তাঁতিয়া তোপী, কুনওয়ার সিং, শহীদ কাজী আবদুর রহীম,  কাজী ইনায়েত আলী খান এসময় জনগণের বিভিন্ন বিক্ষোভের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন।
                   
                      এদিকে ইনকিলাবী যুদ্ধা ও অন্যান্য সাধারণ মানুষের আন্দোলন স্থানীয় আইন-শৃংখলা পরিস্থিতিতে যথেষ্ট জটিলতার সৃষ্টি করেছিল। তাই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সহ বিভিন্ন আনুষঙ্গিক সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার জন্য উলামায়ে কেরামরা জরুরী মজলিস শূরা আহবান করেন। কাজেই প্রথম বৈঠকে সৈয়দ আহমদ শহীদ প্রবর্তিত এ যাবত যে সংস্কারমূলক ও রাজনৈতিক দলীয় ব্যবস্থাপনা চলে আসছিল তাকে একটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার রূপ দেবার সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো। হযরত হাজী ইমদাদুল্লাহ সাহেবকে এই রাষ্ট্র ব্যবস্থার ‘আমীরুল মু’মিনিন’ নির্বাচন করা হলো। মওলানা মুহাম্মদ কাসেম নানুতবী কে সেনা প্রধান , মওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গুহীকে মূখ্য বিচারপতি, হাফেজ যামেন, মওলানা মুহাম্মদ মুনীরের মত নেতৃবর্গকে অন্যান্য গুরুত্ব পূর্ণ দায়িত্বে নিযুক্ত করে হাজী সাহেবের হাতে জিহাদের বয়’য়াত গ্রহণ করা হয় । পরবর্তীতে এক দীর্ঘ আন্দোলন ও অসংখ্য উলামাদের শাহাদত বরনের পর ইংরাজ সরকার তাদেরকে গ্রেফতার করার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করে। জনসাধারণকে বড় বড় লোভ দেখিয়ে তাদের ধরার জন্য চেষ্টা করা হয়, এমনকি কখনো কখনো শাসকরা তাদের নিকটও পৌঁছে যায়। কিন্তু প্রতিবারই তারা বিস্ময়করভাবে গ্রেফতারের হাত থেকে রক্ষা পান। এ ভাবে এক সময়ে ইমদাদুল্লাহ বাহিনীকে আত্মগোপনের পথ বেছে নিতে হয় । হযরত হাজী ইমদাদুল্লাহ সাহেব (রহ) দু’বছর হিন্দুস্তানের বিভিন্ন প্রান্তে আত্মগোপন করে থাকার পর মক্কায় হিজরত করেন ও মওলানা গাঙ্গুহী গ্রেফতার হয়ে ৬ মাসের কারাবরণ দেওয়া হয় ।
                                                       পর্ব  -০
 দারুল উলুম দেওবন্দ:-
মহানবী (সাঃ)-এর যুগ থেকে নিয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিভিন্ন ভূখণ্ডের খোদা-বিমুখ শাসক ও রাষ্ট্রশক্তির দাসত্ব-নিগঢ় থেকে মানবতাকে আজাদ করার জন্যে মুসলমানগণ যে সংগ্রাম করে আসছে, সেটাই প্রকৃত আজাদী সংগ্রাম। আর ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে সেই ভূমিকা পালন করেছিল মওলানা ক্বাসিম নানুতবী প্রতিষ্ঠিত দারুল উলুম দেওবন্দ।
                         ১৮৫৭ সালের গোলযোগের সময় যখন ইংরেজরা সরাসরি দিল্লীকে নিজেদের করায়ত্তে নিয়ে নিলো এবং সম্রাটদের নামে মাত্র আধিপত্যটুকুও খতম করে দিল, তখন ওয়ালিউল্লাহী আন্দোলনের সক্রিয় নেতৃত্ব দানের দায়িত্ব হাজী এমদাদুল্লাহর সহকর্মী শিষ্যদের উপর অর্পিত হলো। তাঁরা মক্কায় অবস্থানরত প্রধান পৃষ্ঠপোষখ হাজী ইমদাদুল্লাহর নির্দেশে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রতি লক্ষ্য রেখে এ আন্দোলনের ধারাকে আক্রমণমূলক না করে প্রতিরক্ষামূলক করার দিকে মনযোগী হলেন। এ উদ্দেশ্যে কর্মপরিষদ দিল্লীস্থ শাহ ওয়ালিউল্লাহর রহীমিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের নমুনায় একটি ইসলামী শিক্ষা ও প্রচারকেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিলেন। এ সঙ্গে তাঁরা এও সিদ্ধান্ত নিলেন যে, দিল্লতে ইংরেজদের নাকের ডগার উপর থেকে এ আন্দোলনের কেন্দ্রস্থল বাইরে নিয়ে যেতে হবে। মওলান কাসেম নানতুবী অন্যান্য সহকর্মীদের নিয়ে এ উদ্দেশ্যে স্থান ও প্রয়োজনীয় বিষয়সমূহের ব্যাপারে তাঁরা চিন্তাভাবনা করতে থাকেন।

অবশেষে ১৮৬৬ খৃঃ দেওবন্দ মওলানা কাসেম নানতুবীর প্রচেষ্টায় প্রস্তাবিত ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্রটি স্থাপিত হয়। দেওবন্দ দারুল উলূম প্রতিষ্ঠার ছয় মাস পর তাঁরই প্রচেষ্টায় ছাহারানপুরে এর আরেকটি শাখা উদ্বোধন করা হয়। এমনিভাবে অল্পদিনের মধ্যেই আরও প্রায় ৪০টি প্রতিষ্ঠান কায়েম হয়।
দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠিত হবার পর ইসলামী আন্দোলনের এসব বীর মোজাহেদদেরই একজন গিয়ে যখন হাজী ইমদাদুল্লাহ সাহেবকে মক্কায় এই সুসংবাদ প্রদান করলেন যে, হুযুর, আমরা দেওবন্দে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছি –এর জন্যে দোয়া করবেন। এ কথা শুনে হাজী সাহেব স্বানন্দে বলে উঠলেনঃ “সোবহানাল্লাহ! আপনারা মাদ্রাসা কয়েম করেছেন? আপনি কি জানেন গভীর রাত্রে কি পরিমাণ মস্তক এজন্যে সিজদায় পড়ে থাকে? আজ বহুদিন যাবতন এ উদ্দেশ্যে আমরা দোয়া করে আসছি যেন আল্লাহ পাক ভারতবর্ষে ইসলাম রক্ষার একটি ব্যবস্থা করেন। এই মাদ্রাসাটি মূলতঃ সে সব বিনিদ্র রজনীর দোয়ারই ফল বিশেষ। দেওবন্দের মাটির জন্যে এটা কতইনা সৌভাগ্যের বিষয় যে, তার বুকে এই মহৎ প্রতিষ্ঠানটির ভিত্তি স্থাপিন হলো”। পরবর্তীতে দারুল উলুম দেওবন্দই এই আন্দোলনের উত্তর সুরির ভূমিকা পালন করে।
রেশমী রুমাল আন্দোলন:- রেশমি রুমাল আন্দোলন (তেহরিক-ই-রেশমি রুমাল) বলতে ব্রিটিশ শাসন থেকে ভারতকে মুক্ত করার উদ্দেশ্যে ১৯১৩ থেকে ১৯২০ সালের মধ্যে দেওবন্দি নেতাদের কর্তৃক সংগঠিত আন্দোলনকে বোঝায়।  একদিকে ইংরেজদের ক্ষমতার দাপট, অন্যদিকে মুসলমানদের ভাগ্য বিপর্যয়। ইংরেজ অগ্রাসনের মুখে রাজনৈতিক অগ্রাসন ছিলো সাধারণ বিষয়।অর্থনৈতিক শোষণের মাত্রা ছিল আরো প্রকট। ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে অগ্রাসন ও নিপীড়ন ছিলো আরো বেশি। বর্তমান ভারতের মত তখনও ইংরেজরা মুসলমানদেরকেই একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবতো। শত্রু মনে করতো আলেম-উলামাকে। এর কারণ ছিলো, যখন অথর্ব মুসলমান শাসকরা প্রতিবাদ করার সাহস পর্যন্ত হারিয়ে ফেলেছিলো, সেই প্রেক্ষিতে আলেম সমাজ শুধু প্রতিবাদী হননি, প্রতিরোধও গড়ে তলেছিলেন। এরপর শুরু হয় ওলামা নির্যাতনের নির্মম ও দুর্বিষহ অধ্যায়। অর্ধ লক্ষাধিক আলেম-ওলামাকে ফাঁসি দিয়ে হত্যা করা হয়। কালাপানি,সাইপ্রাস, আন্দামান ও মাল্টার দ্বীপান্তরে সাজা পান় হাজার হাজার উলামা। সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত,ঘর বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া ছিলো একেবারে সাধারণ ঘটনা। প্রায় সবকটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হয়। সেই সময়ে শুধু দিল্লীর আনাচে কানাচেই চার সহস্রাধিক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান চালু ছিল।
                       উল্লেখ্য এই আন্দোলনের নেতাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন শেয়খুল-হিন্দ মওলানা মাহমুদ হাসান দেওবন্দী।
                                    

বি:দ্র: — তথ্যের স্বার্থে ‘উলামায়ে হিন্দ কি শানদার মাজী’ সহ বিভিন্ন পুস্তক ও অন্তর্জলিকার সাহায্য নেওয়া হয়েছে ।
                                                                              লেখক : মুহাম্মদ ফয়ছল আহমদ, রাতাবাড়ী

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here