চেতনায় চিরন্তন হোক নবীজির বিদায়ী ভাষণ

0
25

সংকলন – মুহা: ফয়ছল আহমদ

বিশ্বজুড়ে আল্লাহর বান্দারা আদায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন এ সময়ের দুই গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত- হজ্ব ও কুরবানী। হজ্ব সম্পন্ন হবে হজ্বের নির্ধারিত স্থান মক্কা,  মীনা়, আরাফা ও মুযদালিফায়। আর বিশ্বজুড়ে মুসলিম জনপদগুলোতে আদায় হবে পবিত্র ঈদুল আজহা সহ সাধারণ কুরবানী। এসময়ে লাব্বায়ীক আল্লাহুম্মা লাব্বায়ীক ধ্বনিতে মুখরিত হচ্ছে পবিত্র নগরী মক্কাতুল মুকাররামা। মুসলিম উম্মাহ অনুসরণ করছেন নবী ইব্রাহিম (আ:) ও মুহাম্মদুর-রাসুলুল্লাহ (স:) এর পূর্ণ পদাঙ্ক ।

ইসলামী ধর্ম তত্ত্ব অনুযায়ী অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এ মুহূর্তে নবী প্রেমীদের হৃদয়াঞ্চলে ঠকঠক করছে  ৯ জিলহজ, ১০ হিজরী সনে (শুক্রবার) দুপুরের পর রাসুলুল্লাহ (সা:) লক্ষাধিক সাহাবিদের সমাবেশে আরাফার ময়দানে বিশ্ববাসীর উদ্দেশ্যে দেওয়া বাগ্মিতা ও প্রাণবন্ততায় ভরপুর হৃদয় নিংড়ানো সেই বিখ্যাত ভাষণ । প্রায় এক লক্ষ বিশ হাজার ছাহাবায়ে কেরামের উপস্থিতিতে যে ঐতিহাসিক বক্তব্যে মানবজাতিকে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের জন্য দিক নির্দেশনা করেছিলেন প্রিয় নবী (স:) । বাল্য জীবন থেকে আরম্ভ করে ব্যক্তিগত সাংসারিক জীবন, পারিবারিক জীবন, বৈবাহিক জীবন, অর্থনৈতিক জীবন, রাজনৈতিক জীবন সহ প্রতিটি দিকে আলোকপাত করেছিলেন মহানবী মুহাম্মদুর রাসুলুল্লাহ(স:)।
                     নবীজি মদিনা থেকে এই উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন যে, বায়তুল্লাহর হজ্জ করবেন, মুসলমানদের সঙ্গে মিলিত হবেন, তাদের দীনের তালিম দেবেন, হজ্জের নিয়ম-কানুন শেখাবেন, সত্যের সাক্ষ্য প্রদান করবেন, আপন অপরিহার্য দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করবেন, অন্ধকার যুগের শেষ চিহ্নটুকু মুছে ফেলবেন । এই হজ্জ হাজারো ওয়াজ-নসিহত, হাজারো দরস ও তালিমের স্থলাভিষিক্ত ছিল। এটি ছিল একটি চলতি ও ভ্রাম্যমাণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ,যা ছিল একটি সক্রিয় ও গতিশীল মসজিদ এবং একটি চলন্ত ছাউনি যেখানে মূর্খ-জাহিলও জ্ঞান দ্বারা সজ্জিত হয়েছিল , গাফিলত তার গাফলত থেকে সজাগ হয়েছিল , অলস চঞ্চল হয়েছিল , কমজোর শক্তিশালী ও বলবান হয়েছিল । এ ছিল রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- এর সাহচর্য, তাঁর স্নেহ ও ভালবাস, তাঁর প্রশিক্ষণ, তত্ত্বাবধান ও নেতৃত্বরূপী রহমতের বর্ষণ।
                      আরাফার ময়দানে বিদায়ী হজ্জ্বের গম্ভীর মুহূর্তে উম্মতের উদ্দেশ্যে কি বক্তব্য দিয়েছিলেন মানবতার শ্রেষ্ঠ নায়ক মহানবী মুহাম্মদ (স:)?  সাহাবায়ে কিরাম (রা:)-এর ন্যায় বিশ্বস্ত ও ন্যায়পরায়ণ বর্ণনাকারিগণের বর্ণনা মতে ৯ই জিলহজ্ব দশম হিজরী মহানবী মুহাম্মাদ (সাঃ) শুক্রবার ফজরের নামাজ আদায় করে সূর্যোদয়ের পর ‘মিনা’ হতে আরাফাহ ময়দানের পূর্বদিকে ‘নমিরা’ নামক স্থানে তাঁবু স্থাপন করা হলে, সেখানে পৌঁছে দুপুর পর্যন্ত তথায় তাঁবুতে অবস্থান করেন। জুমা’র নামাজ আদায় করে তিনি ক্বাছওয়া নামক উষ্ট্রীর উপর আরোহন করে আরাফা’র সন্নিকটে “আরনা”প্রান্তরে উপস্থিত হয়ে প্রায় একলক্ষ বিশহাজার লোকের সমাবেশে নবীজি (স:) তার ঐতিহাসিক বিদায় হজ্বের খুতবা বা ভাষণপ্রদান করেন। তাঁর প্রতিটি বাক্যই রাবিয়া বিন উমাইয়া  বিন খালাফ (রাঃ)-কর্তৃক পুনরাবৃত্তি হয়েছিল। এ ভাষণে নবীজি ইসলামের বুনিয়াদ সমূহ খোলাখুলিভাবে তুলে ধরেন। এবং শিরক ও মূর্খতার বুনিয়াদ ধ্বংস করে দেন। এই ভাষণে তিনি সেই সব হারাম বস্তুকে হারাম বলে ঘোষণা করেন যেগুলো হারাম হওয়ার ব্যাপারে দুনিয়ার তাবত ধর্ম ও জাতিগোষ্ঠী ঐকমত্য পোষণ করে। আর তা ছিল, অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা, ধন-সম্পদ ছিন্তাই করা, নারীর সতীত্ব-সম্ভ্রম নষ্ট করা। জাহিলিয়াতের তাবৎ বিষয়াদি ও প্রচলিত কাজগুলো আপন কদমতলে দাফন করেন। জাহিলিয়াত আমলের সুদ তিনি সমূলে খতম করেন এবং একে সম্পূর্ণ বাতিল বলে অভিহিত করেন। মহিলাদের সঙ্গে উত্তম আচার-আচরণের উপদেশ দেন এবং তাদের যে সমস্ত অধিকার রয়েছে তার বিশ্লেষণ করেন এবং বলেন যে, নিয়ম মুতাবিক আহার, পোশাক ও খোরপোশ তাদের অধিকার। উম্মতে মুহাম্মদীকে তিনি আল্লাহর কিতাব ও সুন্নতে নববীর সঙ্গে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে থাকার ওসিয়ত করেন এবং বলেন, যতদিন তোমরা এর সঙ্গে নিজেদের ভালভাবে আঁকড়ে রাখবে ততদিন তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না।
                নবীজির ভাষায়,  “হে মানব সন্তান! তোমাদের মধ্যে সেই শ্রেষ্ঠ মানুষ, যে মানুষের উপকার করে।” উম্মাতে মুহাম্মাদী তথা সকল মুমিন নর-নারী’র প্রতি বিশেষ-নির্দেশ-“যারা উপস্থিত আছো। তারা অনুপস্থিতদের নিকট আমার এই পয়গাম পৌঁছে দিবে। হয় তো উপস্থিতদের কিছু লোক অপেক্ষা অনুপস্থিতদের কিছু লোক বেশি উপকৃত হবে।” এই ভাবে দীর্ঘ বক্তব্যের নবীজির মানব জীবনের প্রতিটি দিকে কল্যাণ কামী নির্দেশনা দেন।
                                হযরত মুহাম্মাদ সাঃ (ভাষণের কথাগুলো) বলার সঙ্গে সঙ্গে রাবিয়া বিন উমাইয়া বিন খাল্ফ (রাঃ) বিশাল জনতাকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনারা কি জানেন এটা কোন দিন? তারা উত্তর দিলেন এটা পবিত্র হজ্জ্বের দিন। তার পরতিনি আবার জিজ্ঞাসা করলেন আপনারা কি জানেন আল্লাহ আপনাদের জীবন, মাল ও সকল কিছু পবিত্র করেছেন? যতক্ষণ আপনারা তার সাথে মিলিত না হচ্ছেন। তাঁরা উত্তর দিলেন-হ্যাঁ! এভাবে তিনি বাক্যের পর বাক্যগুলো বলতে থাকলেন। যখন হযরত মুহাম্মাদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াসাল্লাম বলে উঠলেন  হে আল্লাহ! আমি কি তোমার রিসালাতের গুরুভার ও নবুয়তের গুরুদায়িত্ববহন করতে পেরেছি? হে আল্লাহ! আমি কি আমার কর্তব্য পালন করেছি? সঙ্গে সঙ্গে বিশাল জনতা উচ্চস্বরে বলে উঠলেন হ্যাঁ! তখন আল্লাহর রাসূল হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াসাল্লাম বলে উঠলেন হে আল্লাহ! তুমি আমার সাক্ষী থাক।”
                    মহানবী (সাঃ) এর বিদায়ী ভাষণ নিছক একটি বক্তৃতামালা নয়, এর প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বাক্য মানব জাতির দিক নির্দেশিকা। এ ভাষণে মানব জাতির বিভিন্ন দিক ও বিভাগ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এ ভাষণের বলার পদ্বতি, আবেগ, শব্দ চয়ন, গাম্ভীর্য সব কিছুই অনন্য, অনবদ্য, বে-নজীর ও বেমেছাল। এ ভাষণ গ্রহণ যোগ্যতার দৃষ্টিকোনে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষণই শুধু নয়, মানবতার শ্রেষ্ঠ সম্পদ ও মানবধিকারের মহা সনদ হিসেবে বিবেচিত। আসুন আমরা এ ভাষণের আলোকে আমাদের ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ কে সাজাই।
_________________
তথ্য সূত্র : ১। মুকাম্মাল তারিখুল ইসলাম, শওকত আলী ফহমী।
                 ২। মহানবী (সাঃ) এর জীবনী;
                  ৩।অন্যান্য ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here