Jan 2, 2018

ঝুলে আছে তাঁদের নাগরিকত্ব।ইতিমধ্যে একজনের আত্মহত্যার খবরও এসেছে

২০১৮ বড় অশুভ সঙ্কেত নিয়ে শুরু হল অসমে। নাগরিকত্বের খসড়া তালিকা ছড়িয়ে দিয়েছে ঘোর উদ্বেগ। ইতিমধ্যে একজনের আত্মহত্যার খবরও এসেছে। ১ কোটি ৩৯ লক্ষ মানুষ নতুন বছর শুরু করলেন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে। ঝুলে আছে তাঁদের নাগরিকত্ব। জাতীয় নাগরিকত্ব পঞ্জীকরণ (এনআরসি)–এর প্রথম বেরনো তালিকায় তাঁদের নাম নেই। ভাষিক ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অসমছাড়া করার পরিকল্পনা অনেকটাই স্পষ্ট এই তালিকায়। তাই সবচেয়ে বেশি নাম বাদ পড়েছে বাঙালি–অধ্যুষিত বরাক উপত্যকায়। নাগরিক তালিকায় নাম নেই এআইইউডিএফ সুপ্রিমো, সাংসদ বদরুদ্দিন আজমল ছাড়াও বিরোধী দলের চার বর্তমান বিধায়কের। নাম নেই আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত উপাচার্য তথা বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী ড.‌ তপোধীর ভট্টাচার্য, ৪০ বছর ধরে অসম থেকে প্রকাশিত দৈনিক সাময়িক প্রসঙ্গের মালিক–সম্পাদক তৈমুর রাজা চৌধুরি, কবি ও প্রাক্তন মন্ত্রী অর্ধেন্দু দে–‌র। তবে লক্ষণীয়, নাম রয়েছে আলফা (স্বাধীন) সুপ্রিমো পরেশ বড়ুয়া ও অরুণোদয় অসম ওরফে বিজিত গগৈ,  এনডিএফবি (এস)–এর কমান্ডার–ইন–চিফ বি বিদাই ওরফে বিষ্ণু গৈয়ারি থেকে শুরু করে জঙ্গি নেতাদের প্রায় সবার। কিন্তু নাম নেই খোদ এনআরসি–র সমন্বয়ক প্রতীক হাজেলার!‌ 
৩১ ডিসেম্বর রাত ১১–৪৫ মিনিটে প্রকাশিত হয় এনআরসি–র প্রথম তালিকা। এখনও পর্যন্ত দেশে একমাত্র অসমেই নাগরিকদের নাম পঞ্জীকৃত করা হচ্ছে। বিজেপিশাসিত অসম সরকার থেকে শুরু করে উগ্র জাতীয়তাবাদী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অভিযোগ, রাজ্যে প্রচুর বাংলাদেশির অনুপ্রবেশ ঘটেছে। তাই বিদেশিদের শনাক্ত করতেই সর্বোচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণে শুরু হয় তালিকা প্রস্তুতি। ভারতের রেজিস্ট্রার জেনারেল শৈলেশ মাঝরাতে সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রকাশ করেন প্রথম তালিকা। তাঁর আশ্বাস, চলতি বছরেই পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশিত হবে। রাজ্যের মোট ৩ কোটি ২৯ লক্ষ মানুষ নাগরিকত্বের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সমেত আবেদন করেন। এর মধ্যে মাত্র ১ কোটি ৯০ লক্ষের নাম প্রথম তালিকায় রয়েছে। শৈলেশ জানিয়েছেন, বাকিদের নাগরিকত্ব যাচাই চলছে। উদ্বেগের কিছু নেই। কিন্তু ঘটনা হল, বাদ পড়ার ধরনটা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বরাকে বাঙালিদের বসবাস প্রায় ১০০ শতাংশ। আর এখানেই এনআরসি তালিকায় নাম নথিভুক্তির হার সবচেয়ে কম। বরাকের অঘোষিত রাজধানী শিলচরে মাত্র ২৯.৮৩ শতাংশ মানুষের আবেদন গ্রাহ্য হয়েছে। গোটা কাছাড় জেলাতে এই সংখ্যা ৩৫.২৪ শতাংশ। বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী করিমগঞ্জ জেলায় ৪০ শতাংশ নাম উঠেছে এনআরসিতে। বরাকের সবচেয়ে ভাল পরিস্থিতি উদারবন্ধ মহকুমায়। সেখানে ৫০.১৭ শতাংশ মানুষ সন্দেহের ঊর্ধ্বে উঠতে পেরেছেন। বছরের প্রথম দিনই কাছাড় জেলার কাশীপুরে মণিপুরি মুসলিম হানিফ খান (৪৫) গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেন। পুলিস মুখে কুলুপ আঁটলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, এনআরসিতে নাম না থাকায় হতাশা থেকে আত্মহত্যা করেছেন হানিফ। অনেকে রাজ্য ছাড়ার কথাও ভাবছেন। অসমের মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল অবশ্য অভয় দিয়ে গুয়াহাটিতে সাংবাদিকদের বলেছেন, এখনই আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। দ্বিতীয় তালিকায় বৈধ নাগরিকদের নাম থাকবে বলেও আশা প্রকাশ করেন। তবে তাঁর দলের রাজ্য সভাপতি রঞ্জিতকুমার দাস জানিয়ে দিয়েছেন, ‘‌২০১৪–র আগে অবধি আসামে আসা হিন্দুরা নিশ্চিন্ত। তবে ‘‌বিদেশি’‌ মুসলিমদের রাজ্য ছাড়তে হবে।’‌ প্রয়োজনে ভারতের অন্য রাজ্যে ‘‌বাংলাদেশি মুসলিমদের’‌ আশ্রয় নিতে বলেন তিনি। বিজেপিরই জোট শরিক অসম গণপরিষদের রাজ্য সভাপতি অতুল বরার দাবি, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পর যাঁরাই অসমে অনুপ্রবেশ করেছেন, জাতি–ধর্ম নির্বিশেষে তাঁদের রাজ্য ছাড়তে হবে। কংগ্রেস অবশ্য মনে করে, অসমে বিদেশি শনাক্তকরণের নামে সংখ্যালঘুদের নির্যাতন করছে বিজেপি। রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা কংগ্রেস নেতা তরুণ গগৈ আগেই দাবি করেছেন, ‘‌অসমে একজনও বাংলাদেশি নেই।’‌ এদিকে, তালিকা প্রকাশের আগেই প্রচুর সেনা ও আধাসেনা মোতায়েন করা হয় রাজ্যে। অতিরিক্ত ৪৫ হাজার আধাসেনা মোতায়েনের কথা সাংবাদিকদের জানিয়েছেন অতিরিক্ত পুলিস প্রধান পল্লব ভট্টাচার্য। 
চলছে সোশ্যাল মিডিয়াতেও নজরদারি। মুখ্যমন্ত্রী সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, এনআরসি নিয়ে কোনও প্রতিবাদ বরদাস্ত করা হবে না। এই অবস্থায় প্রতিবাদে শামিল হতে সাহসও পাচ্ছেন না নাগরিকেরা।
রাজনৈতিক দলগুলির এই কাজিয়ার মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ছে সংখ্যালঘুদের। নাগরিক মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক সাধন পুরকায়স্থ শিলচর থেকে আজকাল–কে বলেন, ‘‌সবাই হ্যাপি নিউ ইয়ার পালন করলেও অসমের বাঙালিদের কোনও আনন্দ নেই। নতুন বছর আমাদের কাছে অশুভ বার্তা বয়ে এনেছে। ৭০ শতাংশ বাঙালির নাম বাদ। ইতিমধ্যেই একজন আত্মঘাতীও হয়েছেন।’‌ বিশিষ্ট আইনজীবী হাফিজ চৌধুরি বলেন, ‘‌প্রথম তালিকা ভুলে ভরা। একই পরিবারের কারও নাম আছে, কারও নেই। ভরসা এখন দ্বিতীয় তালিকা।’‌ হাফিজ চৌধুরির নিজের নাম থাকলেও আত্মীয়দের অনেকেরই নাম নেই। নাম নেই গুয়াহাটির বিশিষ্ট সাংবাদিক আফ্রিদা হোসেনেরও। অথচ তাঁর স্বামী ও সন্তান এবং বাপেরবাড়ি ও শ্বশুরবাড়ির সকলের নাম রয়েছে। বাগবর কেন্দ্রের বিধায়ক শুকুর আলি, রূপহির নুরুল হুদা, গৌরীপুরের মিজানুর রহমান এবং চাঙ্গা কেন্দ্রের শেরমনিনের নাম নেই। নাম নেই সাবেক মন্ত্রী অর্ধেন্দু দের। বাদ পড়েছেন নিখিল অসম সংখ্যালঘু ছাত্র সংস্থার সভাপতি আজিজুর রহমানও। ‘‌দৈনিক সাময়িক প্রসঙ্গ’–এর সম্পাদক তৈমুর রাজা চৌধুরি বলেন, ‘‌আমার বংশেরই কারও নাম নেই ভারতীয় নাগরিক তালিকায়।’‌ একই অবস্থা তপোধীরবাবুরও। এঁদের সকলের নথিপত্র যাচাই করার কাজ নাকি এখনও চলছে। 
অসমের সঙ্গে ত্রিপুরার সীমান্ত রয়েছে ৫৩ কিমি। পুলিস সূত্রে জানা গিয়েছে, সেখানে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সতর্কতা জারি করা হয়েছে সীমান্তবর্তী থানাগুলিতে। রাজ্যে সামনেই বিধানসভা নির্বাচন। সেটা মাথায় রেখে আগে থেকেই ভিন রাজ্য থেকে আসা মানুষদের ওপর নজরদারিও চলছে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে। উত্তর ত্রিপুরা ও ঊনকোটি জেলার বহু মানুষের আত্মীয়রা থাকেন অসমে। তাঁদের দুশ্চিন্তা বাড়ছে।‌
                                                                                তরুণ চক্রবর্তী, আগরতলা

No comments: